দুই তিন দিন

গত ১০ মে ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার নিয়োগের পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষাটা ছিল সকাল ১০:৩০ এ। আমাকে ৩৩৪ কি.মি. পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হবে ঢাকায়।এত দূর থেকে পরীক্ষা দিতে ঢাকায় গেলে শরীরে যতটা এ্যানার্জি থাকে তার অর্ধেক রাস্তাতেই শেষ হয়ে যায়। তাই আমি একদিন হাতে নিয়েই ঢাকা যাই যেন রাতটা বিশ্রাম নিয়ে পরদিন পরীক্ষা দিতে পারি। বাংলাদেশে বেকারদের অবস্থা খুবই করুণ। কোন ছোট-বড় পদ নয় সরকারি চাকরীতে নিয়োগের সার্কুলার হলেই আবেদনের হিড়িক পড়ে। লক্ষাধিক বেকার খুব ভালোভাবে পড়াশুনা করেও বেশি পদ ফাঁকা না থাকায় ফল ভালো হয় না। আগে অনার্স মাস্টার্স শেষ করা শিক্ষিতের সংখ্যা ছিল খুবই কম। ফলে চাকরীতে প্রবেশের জন্য তাদের এত জটিলতাও ছিল না। আজকের দিনে উচ্চ শিক্ষিতের সনদপ্রাপ্তদের সংখ্যা যে হারে বেড়েছে সে হারে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা আমাদের মত দেশে ওতোটা সহজ নয়। কিন্তু সমস্যাটা যে রাষ্ট্রীয় এতে কোন সন্দেহ নেই। তবুও চাকরীর জন্য ছুটতে থাকা বেকারদের একাংশ সৃষ্ট এই সমস্যাকে নিয়তি ভেবে এগিয়ে চলে দিনকে দিন।
এরই মধ্যে সমাজে এক অলিখিত নির্ণয় চালু হয়ে গেছে। যে শিক্ষিত উচ্চ শিক্ষা নিয়ে সরকারি কোন চাকরী নিতে ব্যর্থ হয়, তার সামাজিকভাবে তেমন কোন মূল্য নেই! শিক্ষিতের মূল্যায়ন হয় আজকাল সরকারি চাকরী, নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এসবে !

আমি ৯ তারিখ সকালে মিরপুর -১ এ বন্ধুর বাসায় পৌছালাম। দীর্ঘ আট নয় ঘন্টা যাত্রা শেষে শরীরের অবস্থা ক্যাতক্যাত হয়ে গেছে। চুলগুলোতে মনে হয় কেউ আঠা মেখে দিয়েছে। চোখে মুখে ধুলোর স্তর পড়ে গেছে! চোখের পাতাগুলো যেন সরতে চায় না!
বন্ধু আমাকে সযত্নে রিসিভ করে ফ্রেশ হওয়ার জন্য বাথরুম দেখিয়ে দিল। আমি বাথরুম সেরে আসলাম। খুব পিপাসা লেগেছিল। একটু পানি পান করবো। ওরা আবার পানি ফুটিয়ে পান করে। ফুটানো পানি আর সাধারণ পানির স্বাদের যে ভিন্নতা তা আমি আগেও বুঝেছি। আমি পানি পান করলাম কিন্তু তৃপ্ত হলাম না।
শরীর খুব ক্লান্ত। তাই বিছানায় শরীর এলিয়ে দিতেই ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি দুপুর পেড়িয়ে গেছে। বাইরে অত্যধিক গরম এটা টের পাচ্ছি রুমে দুটো ফ্যান চলছে তারপরও কেমন লাগছে সেটা অনুভব করেই।
বন্ধু এসেছে অনেক দূর থেকে, বন্ধুকে তো অাপ্যায়ন করতে হবে। কিন্তু কিভাবে?
ওরা যে বাসায় থাকে তাতে ও বাদে সবাই রোজা রাখে। এজন্য খাবার একটু সমস্যা। আমি অবশ্য বাস থেকে নেমেই হোটেলে খেয়ে যেতাম। কিন্তু সকালে কোন হোটেল খোলা ছিল না। তাছাড়া ওখানকার ভাতের হোটেলগুলো বন্ধ থাকে। আমার বন্ধু আমাকে জানালো, রাতের অবশিষ্ট ভাতগুলোয় নাকি পানি ঢেলে পান্তা করে রেখেছে ওর বাসামেটগুলো। অনেকদিন পান্তা খাওয়া হয় না। আমি আর আমার বন্ধু মিলে পাশে বাজার থেকে শুটকি মরিচ পেয়াজ এনে তা ভেজে শুটকি আলু ভর্তা দিয়ে পান্তা খেলাম। আমি কিন্তু বেশ ভালোই খেলাম। আজকাল তো মানুষ পয়লা বৈশাখে ছাড়া পান্তা খায়ই না। আমাদের বাড়িতে একসময় প্রায়ই সকালে পান্তা খেতাম। শুটকির ভর্তা, কাঁচা মরিচ-পেয়াজ,লবন দিয়ে খাইতাম যা এখনো মনে করিয়ে দেয় সোনালী অতীত।
পান্তা খেলে নাকি ঘুম ভালো হয়। আমরা দারুণ একটা ঘুম ঘুমালাম। সন্ধ্যা হবার আগেই উঠলাম। বন্ধুর রুমমেট বন্ধুটি সহ অন্যরা সবাই মিলে ইফতার আয়োজন করেছে। খুব অান্তরিকতার সাথে তারা আমাকে ডাকলো, অামন্ত্রণ করলো। আমি তাদের সাথে অংশগ্রহন করলাম। তাদের আন্তরিকতা বেশ ভালোই লাগলো। আমি আগেও বহুবার ইফতার করেছিলাম। আমার সাবেক রুমমেটরা আমাকে নিজের ছোট ভাইয়ের মত করে সাথে নিয়ে ইফতার করতেন। আমি তাদের প্রতি এক গভীর টান অনুভব করি।
তারপর রাতে খাবার খেয়ে আবার ঘুম। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই ফ্রেশ হয়েই একটু পানি মুখে দিয়েই বন্ধুর নির্দেশনায় বেড়িয়ে পড়লাম পরীক্ষা সেন্টারের দিকে। মিরপুর-১ থেকে খিলগাঁও, আলী আহমেদ স্কুল এন্ড কলেজ। ‘বাহন’ নামের বাসে উঠে আমি খিলগাঁওয়ে পৌছালাম। ভাড়া নিল ৪৫ টাকা। বাসে এত বেশি টাকা ভাড়া ঢাকা শহরে এই প্রথম দিলাম। বাস থেকে নেমেই এক বড় ভাইয়ের সাথে দেখা। ওনার পরীক্ষাও আমার সাথে,একই সেন্টারে। ওনি সাথে করে ওনার ছোট ভাইকে নিয়ে যাচ্ছেন (যে এবার অনার্স শেষ করলো) যাতে বুঝতে পারে বাংলাদেশে চাকরীর অবস্থা কেমন।

অনেক দূরে গিয়ে হঠাৎ পরিচিত কাউকে দেখলে পরিচিত মানুষের প্রতি এক অন্যরকম ভালোবাসা কাজ করে। খুব আপন মনে হয়। আমরা আলাপ করতে করতে অনেকটা হেঁটে পরীক্ষা সেন্টারে গেলাম।

“ভাই, রোজা আছেন?”
ভাই বললো নারে, রোজা নাই।
“কিছু খেয়েছেন?”
-“হ্যাঁ, আমরা বাসায় খেয়ে এসেছি।
তুমি খেয়েছো?”
আমিঃ না ভাই, খাইনি।
ভাই বললো, “চল দেখি আশেপাশে নাস্তার দোকান খোলা আছে কিনা।”
আমরা এক নাস্তার দোকান পেলাম যেটা সবেমাত্র খুললো। আমি একটা কেক খাইলাম। ভাই সিগারেট ধরালেন। তারপর তিনজনই চা খেলাম।

পরীক্ষার সেন্টারে ঢুকলাম সাড়ে ন’টায়। পরীক্ষা শেষে ভাইয়ের সাথে বিদায় নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম। ঢাকা শহরে আমি কিছুই চিনি না তেমন। মাঝে মাঝে দিক মিলাতে পারি না। পশ্চিমকে মনে হয় দক্ষিণ, পূর্বকে উত্তর! তবে সমস্যা হয় না, স্ট্রিট ভিউ চালু করে মোবাইলের স্ক্রিন দেখে দেখে যেতে পারি। বাইরে প্রচন্ড গরম। হালকা তাপমাত্রা সহ্য করে অভ্যস্ত শরীরে আমার দর দর করে ঘাম ঝড়ছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাস খুঁজছি। একে তো জানি না কেন বাস কোথায় যায়, বাসের গায়ে লেখা দেখে দেখে বাসে উঠার লাগে। অবশেষে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে বাসে উঠলাম। বাসায় এসে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

বন্ধু আমার ততক্ষণে ভাত রান্না করা শুরু করে দিয়েছে। আমি এক ক্লান্তির গোসল শেষে দুজনে দুপুরের খাবার খাইলাম। তারপর একটু ঘুমিয়ে আবার রাত ন’টায় বেরিয়ে পড়লাম গাবতলি বাস টার্মিনালের দিকে। রাত ১০টায় আমাদের বাস। বাসে উঠে একটা ক্লান্তির ঘুম দিয়ে দিলাম। আড়াইটার দিকে আমরা ফুট ভিলেজে পৌঁছলাম। সেখানে এসে দেখি বাউল সুকুমার সরকারের মত এক লোক। আমি এবং আমার এক ভাই, আমরা তাঁর কাছে গেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি বাউল সুকুমার সরকার কিনা।
তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি বাউল সুকুমার সরকার।
ইদানিং তার –

”বলবোনা গো আর কোনদিন ভালোবাসো তুমি মোরে,,,,
গানটি ভাইরাল হয়েছে। আমি অনেকবার গানটি শুনেছি। বেশ দরদি কন্ঠে গেয়েছেন।
তারপর আবার ঘন্টা চারেক পরে আমরা গন্তব্যে এসে পৌছালাম। যেন মায়ের কোলে এসে পৌছালাম। সূর্য তখনো উঠে নি। কিন্তু চারপাশটা বেশ ফটফটে। শান্ত পরিবেশ। দু একটা পাখি কিচিরমিচির করছে, কাকেরা এদিক থেকে ওদিকে উড়ছে। এক সুনির্মল হাওয়া আমার সমস্ত ক্লান্তিকে ভুলিয়ে তৃপ্ত করতে আমাকে শিহরিত করলো। আমি মেসে এসে ফ্রেশ হয়ে তৃপ্তিভরে মাতৃদুগ্ধের ন্যায় সুমিষ্ট পানি পান করে তৃপ্ত হলাম। রুমমেট ঘুমায়, আমিও এক গভীর ঘুম দিয়ে দিলাম। উঠে দেখি প্রায় দুটা বাজে। খিদায় পেট চো চো করছে। আমি মেস থেকে কিছুটা দূরে এক খাবারের হোটেল আছে সেখানে খেতে গেলাম। বেশ ভালো রান্না করে। ভাতের জন্য হোটেলটা স্পেশাল। সাধারণত হোটেলে খেলে আমার গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয় কিন্তু সেখানে খেলে তেমন কোন সমস্যা হয় না। খেয়ে এসে দুই রুমমেট মিলে আবার ঘুম । রুমমেট আমার ফোর্থ ইয়ার ফাইনাল দিচ্ছে। দুজনে আমরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ আমার মনে হলো রুমমেটতো রোজা আছে। ইফতারের তো সময় চলে যাচ্ছে। তখন বাজে ৬ টা ২৪। আমি রুমমেটকে নাম ধরে ডাকলাম, ভাইয়া উঠো, উঠো,,
তোমার ইফতারের সময় চলে যাচ্ছে। রুমমেট তাড়াহুড়ো করে উঠে ইফতার নিয়ে আসলো। আমি শরবত বানালাম। তারপর আমাকে নিয়ে সে ইফতার করলো।
কয়েকদিন বাইরে খেতে খেতে পকেটের অবস্থা খারাপ। পুরো মাস এভাবে যাবে। এটা বুঝতে পেরে রুমমেট ছোট ভাইটা তার এক হিন্দু বন্ধুর মেসে মিল চালু করার জন্য বলেছে সেটা আমাকে বললো।
এই দুইদিন বাসে, বাসায় বেশ ঘুমিয়েছি। আমার মা বলতো, শোকের চেয়ে ভোগ(ক্ষুধা) বড়, ভোগের চেয়ে ঘুম।
আমার শরীর ক্লান্ত হলে আর রক্ষে নেই, যে করেই হোক একটু ঘুমের যায়গা চাই।
কিছুদিন ধরে তেমন কিছুই পড়িনা। খুব অলস আর সামাজিক জীবন-যাপন করছি। সামাজিক জীবন-যাপন মানে এই যে একটা চাকরী পেতে হবে, এটা করতে হবে সেটা করতে হবে – এসব।
আহমেদ ছফার ‘যদ্যপি আমার গুরু’ বইটা খুব সময় নিয়ে যত্ন সহকারে পড়ছিলাম। কয়েকটা পেইজ বাকী ছিল। হাতে নিয়ে শুয়ে শুয়ে বইটা পড়া সমাপ্ত করলাম। এরই মধ্য অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যত নিয়ে নানান ভাবনা আমাকে ভাবিত করলো। বাংলার লেখকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীলতা গুণটি আমাকে খুব পীড়া দেয়। সে আমাকে, আমার আদর্শকে পচিয়েছে, আমি তাকে, তার আদর্শকে পচাবো। আমাকে লিখতে হবে অমুককে ডিফেন্ড করে। লেখক বুদ্ধিজীবীদের এমন মনোভাব মানুষকে কখনো মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগের বৃত্ত থেকে বের করতে পারে না। যা পারে তা হলো গন্তব্যহীন এক বাজে ভবিষ্যতের দিকে ঢেলে দিতে।
এসব করতে করতে টিউশনের সময় হয়ে গেল। পড়াতে যেতে হবে অনেকটা দূরে।

বিকেল ৩ টা বেজে ৪৫ মি.
<১২ মে, ২০১৯খ্রি.>

Advertisements

গড্ডলিকা প্রভাহে ভাসছে গা

খুব অল্প বয়সেই শরীরের ওজন বাড়িয়ে এ প্লাস করে ফেলেছে! যে বয়সে শারীরিক ও মানষিক সুস্থতার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম ও খেলাধুলা করা প্রয়োজন, সেই সময়টাতে উঠতি বয়সেই বালকেরা বাজি ধরতে শিখে গেছে! খেলতে শিখে গেছে টিভির পর্দার সামনে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বা অন্য কোন দলের কট্টোর সমর্থক হয়ে! কিভাবে আরেক দলের সমর্থককে চরমভাবে ঘায়েল করা যায়, তা তাদের আজ সিদ্ধহস্ত। খেলা হচ্ছে রাশিয়ায় কিন্তু হাওয়ার বেগটা যেন আমাদের ওপরই বেশি! রাস্তা-ঘাটে, আড্ডায় বা অন্য কোনখানে, যেখানেই কয়েকজন একসাথে হয়, সেখানেই ফুটবলাবলি! এ নিয়ে বিভিন্ন সমর্থকদদের মধ্যে কোপাকুপি পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে!
লিংকঃ

http://www.banglatribune.com/country/news/334825/%E0%A6%96%E0%A7%81%E0%A6%B2%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%87-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A6%95%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%95%E0%A7%81%E0%A6%AA%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%BF%E0%A6%B2

একেকজনের কাছে শুনলে মনে হবে যেন প্রত্যেকেই এক একজন ফুটবল বিশ্লেষক। কত সুন্দর ভাবতে পারে সবাই। কিন্তু হায়!
মাত্র অল্প কয়দিনে নিজের দেশের কত মানুষ সরক দূর্ঘটনায় মারা গেল, তার খবর কেউ রাখে না! কেন সরক দূর্ঘটনা হয়, এ বিষয়ে যেন কারো ভাবনার গোলপোস্টে বল ঢুকে না!
https://www.jagonews24.com/topic/%E0%A6%B8%E0%A7%9C%E0%A6%95-%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%98%E0%A6%9F%E0%A6%A8%E0%A6%BE
এত্তগুলো প্রাণ নিমিষেই ঝরে পড়ার পরেও এ বিষয়ে কোন আলোচনা নেই! সব মাতামাতি যেন অকাজে! রঙ বেরঙের যেসব ফুটবল তারকা দেশের পতাকা উড়ছে আশেপাশে, এসব কেন জানি কালো হয়ে যায়! মনে হয়, সবাই রাষ্ট্রীয় শোক পালন করছে সরক দূর্ঘটনায় কয়েকদিনের মৃত্যুতে!

দেশে কত শিক্ষিত বেকার । কর্মসংস্থান নেই। ইতোমধ্যে একটা বড় সংকট তৈরি হয়ে গেছে! সব বেকারের কর্মসংস্থান হবে, ভাবনাটা হবে এমন। কিন্তু না, ব্যাপারটা হয়েছে এমন – নিজে বাঁচলে বাপের নাম!

গ্রামে কৃষকের হা-হুতাশ সৃষ্টি হয়ে গেছে! ধানের দাম নেই! যত টাকা খরচ করে তারা এক বিঘা জমিনে ফসল ফলায়, সেই ফসল বিক্রি করে তাদের আসল টাকাই ওঠে না!

ভিতরে ভিতরে মানুষের মধ্যে অসহিষ্ণুতার একটা শক্ত আবরণ পড়ে গেছে! কেউ কেউ সরাসরি সেই আবরণের যত্ন করিতেছে!এসব পরিবর্তন লাভের না ক্ষতির এসবে কারো ভাবনা নেই!

এমন অসংখ্য বিষয় আছে যা চোখ খুললেই দেখা যায় এবং এসব বিষয়ে ভাবনা খুব জরুরী। কিন্তু আমরা চোখ বন্ধ করে অন্ধ সেজে এসব বিষয় দেধারচে এড়িয়ে চলছি!

নষ্ট তালা

ক্যারিয়ার বিষয়ক ক্লাশে কথা প্রসঙ্গক্রমে শিক্ষকের আসনে থাকা ভদ্রলোক বললো,জীবনে প্রেম কে কে করেছে?
– ছাত্র-ছাত্রী প্রায় সবাই হাত তুললো।
জীবনে প্রেম কে কে করেনি?
– অল্প কয়েকজন হাত তুললো!
এ অবস্থা দেখে শিক্ষকের আসনে থাকা ভদ্রলোক ইঙ্গিতে বললো, তারাতারি ডাক্তার দেখা!
এ কথা শুনে চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল!
তারপর আবার বললো, তোমাদের মধ্যে কে কে একাধিক প্রেম করেছো?
-সাহস করে গোটা তিন-চার জন ছাত্র হাত তুললো।
তারপর সেই ভদ্রলোক রসিয়ে রসিয়ে এদের প্রশংসা করে সবার উদ্দেশ্যে বললো, যে তালা একাধিক চাবি দিয়ে খুলে -সে তালা?
সে তালা নষ্ট তালা।
আর, যে চাবি দিয়ে সব তালা খুলে – সে চাবি?
সে চাবি মাস্টার পিস।
এ কথা শুনেই চারদিক থেকে সবাই তালি দেওয়া শুরু করেছে! মজায় ফেটে পড়ছে কেউ কেউ! ক্যারিয়ার সেমিনারে ভদ্রলোক দারুণ জমাতে পেরেছে!
এখানে উচ্চারিত
তালা এবং চাবি দিয়ে মহিলা ও পুরুষদের যে সেক্সচুয়ালি বুঝানো হয়েছে, নিঃসন্দেহে এটি সবাই বুঝতে পেরেছে।তবুও এতে সবাই মজেছে! মেতেছে!
একটা ছেলে একাধিক মেয়ের সাথে প্রেম করলে তার যোগ্যতা বেড়ে যায়! সে হয়ে যায় মাস্টার পিস!
আর একটা মেয়ে একাধিক ছেলের সাথে প্রেম করলে, সে হয়ে যায় নষ্ট তালা!!
এসব কথায় এদেশে সবাই মজা পায়! তালি দেয়! তাও আবার ক্যারিয়ার বিষয়ক সেমিনারে,যেখানে সবাই অ্যাডাল্ট ও উচ্চ শিক্ষিত!

ষড়যন্ত্র

বাংলাদেশে মনে প্রাণে বাঙালি খুব কমই আছে । যে দু’একজন আছে তারাও পড়েছে অসুখে ; জ্বালা-পোড়া অসুখে। মাঝেমাঝেই এদের জ্বালা-পোড়া শুরু হয়। তারা আজকাল পিঁয়াজের খোসা তুলে তুলে নতুন কিছু বের করার মত করে বাঙালির সংস্কৃতি রক্ষা করতে চায়! এটা চলবে না, ওটা চলবে না, ওভাবে হবে না, এভাবে হলে কোন সমস্যা নেই – এসব করতে করতে সর্বশেষ কোথায় পৌছাবে তারা নিজেরাও জানে না। বাঙালিত্বের নতুন নতুন রূপরেখা বাঙালি জাতির শরীরে বারংবার অস্ত্রপাচার করছে! এ অস্ত্রপাচার শুধু কোন পক্ষের মন রক্ষার্থে নতুবা মৃতকে দীর্ঘদিন জীবিত রাখার স্বার্থে! কারণ দুইয়ের যেটাই হোক -ক্ষতিকর!

ফেইসবুকে নানান গৃহ ঘুরে, ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও/বয়ান দেখে আমি এইটুুক সিদ্ধান্তে পৌছেছি যে, এক অনন্ত ষড়যন্ত্র চলছে বাঙালির শেষ বিন্দু ধ্বংস করতে!

এজন্য ‘শুভ নববর্ষ ‘ বলতে গিয়ে কাল অবদি বহুবার থেমেছি। লোক দেখানো এসব কালচারে কী আসে যায়, যেখানে ভিতরটায় গভীর ক্ষত?

স্মৃতিচারণ

বয়সে একদম নতুন বলে স্কুলের নাম অনেকেই ‘নয়া স্কুল ‘ বলতো। মফস্বলের মধ্যে নতুন হওয়া স্কুলে তাই অনেক কিছুই ছিল না। সবেমাত্র বাঁশের ধারার টাটির পরিবর্তে ইট গেঁথে উপরে খাড়া টিনের ব্যবস্থার মধ্যে চলতো পাঠদানের কার্যক্রম।
জানিনা আমার এক যুগ আগেকার স্মৃতির রোমন্থনের সাথে কেমন উন্নয়ণ হয়েছে আমার সেই স্মৃতির বিদ্যাপীঠের।
সেখানকার সম্মানিত শিক্ষকগণের কথা মনে পড়ছে । যারা আমাদের ক্লাস নিতেন তাঁদের সবাই আমার কাছে খুব শ্রদ্ধার ছিলেন। এ তালিকায় বাদ যায়নি আমার শিক্ষক, জেঠতুতো ভাইও। যাক্ আজ শুধু আমি একজন শিক্ষকের কথাই লিখবো।

তিনি আমাদের বাংলা ক্লাস নিতেন। নামঃ বাবুল চন্দ্র দেব নাথ। খুব রসিয়ে রসিয়ে কথা বলতেন তিনি। বেশ ফর্সা এবং স্বাস্থ্যবান স্যার নিজে হাসতেন, আমাদের হাসাতেন আর মজায় মজায় মাধ্যমিকের বাংলা সাহিত্য পড়াতেন। মফস্বলের পড়াশোনার দুরবস্থার দরুণ আমরা অনেকেই জানতামই না যে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে নোট-গাইড ছাড়া পড়ার কোন বই আছে! স্যার আমাদের কখনো কখনো পড়াশোনার গুরুত্ব বুঝাতে ক্লাসে আমাদের সামনে আবৃত্তির স্বরে ও ভঙ্গিতে উচ্চারণ করতেন –

”রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত-যৌবনা – যদি তেমন বই হয়। “

এটা বলে চমৎকারভাবে বলতেন- ওমর খৈয়াম।

আমার ব্যক্তিগতভাবে লাইন ক’টা খুব ভালো লাগতো। পড়ানোর ফাঁকে তিনি আমাদের গল্প শোনাতেন। তখন আমি নবম শ্রেণিতে পড়ি। সেই সময়ে আমি প্রথম ‘হৈমন্তী’ ও ‘বিলাসী’র নাম শুনি স্যারের মুখে। স্যার ‘হৈমন্তী ‘ গল্পে তৎকালিন সমাজব্যবস্থা ও যৌতুকপ্রথার বলি গল্পের নায়িকা হৈমন্তীর করুণ কাহিনি তুলে ধরতেন। ‘বিলাসী’ গল্পেও একইভাবে মৃত্যুঞ্জয়-বিলাসী-ন্যাড়ার মাধ্যমে সমাজের বাস্তবতা ও কুসংস্কারের যে ছবি লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন – তা বুঝাতে চাইতেন। আমার কাছে এসব ছিল অনেক পাওয়া। স্যার হয়তো অনেক ভাবতেন; আমাদের মত পিছনে পড়ে থাকা ছাত্র-ছাত্রীদের কথা চিন্তা করতেন।

আমার স্পষ্ট মনে আছে, স্যার একদিন ক্লাস শেষে আমাদের এক এক ক’রে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী। অর্থাৎ বড় হয়ে আমরা কী হতে চাই? সবাই যে যার মতো মুখস্ত কিছু শব্দ উচ্চারণ করলো ওই ছোট বয়সে যেমনটা বলে। কেউ বললো আমি ডাক্তার হতে চাই, কেউ বললো ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই এমনসব। আমার কাছের বন্ধুটি বলেছিল, “আমি পুলিশ হতে চাই। ” তার মনে আছে কিনা জানিনা কিন্তু সে আজ পুলিশ হতে পারে নি। সে আজ এক বেসরকারি ব্যাংকে জব করে। একই প্রশ্ন আমাকে করাতে আমি বলেছিলাম – স্যার, আমি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে চাই। সবার উঁচু উঁচু লক্ষ্যের ভিরে যেন আমার লক্ষ্য ছিল লক্ষ্যহীন। আমার বন্ধু-বান্ধবদের অনেকেই আজ ঝরে পড়েছে। কেউ কেউ সংসার সামলাচ্ছে; বাস্তবতায় হয়ে গেছে অনেক ব্যস্ত। স্যারকে আজ আমার বলার খুব ইচ্ছে হচ্ছে – স্যার, আমিই বুঝি আমার লক্ষ্য পূরণ করতে সচেষ্ট হয়েছি। আজ আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মোটামুটি শেষ। আজ যখন দেখি – কত অসৎ মানুষ চোখের সামনে, কত মানুষ অন্যায় করছে উঁচু উঁচু কর্মক্ষেত্রে উঁচু উঁচু পদবী নিয়ে – তাদের মধ্যে নিজের সততা ও ন্যায়বোধ নিয়ে শিক্ষিত থাকাতেই আমি খুব সুখীবোধ করছি, স্যার।

একদিন ক্লাসে স্যার আমাদের একটা গল্প বলেছিলেন এভাবে —-

“মনেকর, এই ক্লাসরুমে এক দৈত্য এসে তোমাকে একবস্তা টাকা দিল। সেই টাকায় তুমি কী করবে? ”

আমরা যে যার মতো উত্তর দিলাম। কেউ বললো বাড়ি বানাবো, কেউ বললো গাড়ি কিনবো। মোটামুটি সবারই ছিল এমন চিন্তাহীন সব উত্তর।
স্যার তখন আমাদের বলেছিলেন এভাবে- যে স্কুলে এই টাকাটা পেলে সেখানকার উন্নয়ণ নিয়ে কেউ কিছু বললেনা! আমি আমার ভুলটা ধরতে পেরেছিলাম। আজ দেখছি – আমাদের সমাজের অবস্থাটা হলো ছোট্ট আমাদের অপরিপক্ক উত্তরগুলোর মতো।
স্যারের এমন অনেক কথা মনে পড়ে। ক’দিন আগে দীর্ঘ দশ-বারো বছর পর স্যারকে ফোন করেছিলাম কিন্তু স্যারের ব্যস্ততার জন্য কথা বলা হয়নি। এরই মধ্যে আমাদের ছাত্র-শিক্ষকের অনেক দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে । স্যার হয়তো বুঝতেও পারেননি যে আমি ফোন করেছিলাম।
এখনো আপনাদের খুব শ্রদ্ধা করি, স্যার। আপনাদের দেওয়া শক্তিই তো আমাকে এতোদূরে নিয়ে এসেছে ।
পরিশেষে আপনাদের মঙ্গল কামনা করে শেষ করছি। ভালো থাকবেন।

নারীর কথা

হুট করে চাইলেই তো আর নারীরা পুরুষদের সাথে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলতে পারে না। তারা জানে পুরুষেরা মাথায় যৌনতা নিয়ে ঘুরে। নারীর একটু ছোঁয়াতেই তাদের(পুরুষের) শরীর শিহরে উঠে,দন্ডে রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যায়। তাছাড়া তারা রাস্তা-ঘাটে চলতে ফিরতে এও বুঝে গেছে যে, লোকলজ্জা বা সামাজিকতার খাতিরে অন্য সবকিছু থেকে রক্ষা পেলেও চোখের ধর্ষণে আপনজনদের কাছ থেকেও রক্ষা পায় না নারী!
আজকাল অনেকে বলাবলি করে যে, নারীরা পুরুষদের সম-অধিকার চায় অথচ তারা পুরুষের মত সমাজে ভুমিকা রাখে না, কর্মক্ষেত্রেও না এমনকি তারা পুরুষদের মত প্রতিকূলতায় টিকে থাকার যোগ্য না! আসল পয়েন্ট এটাই যে, অনেকের মতে নারীরা পুরুষদের মত প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার যোগ্য না! হ্যাঁ, এটা অনেকেই ভাবে। আসলে পুরুষেরা কখনও ভোগ্য হয় না কিন্তু নারীদের এখনো ভোগ্য ভাবা হয়।
ঐ যে অনেকসময় দেখলেই আমাদের বিশেষ স্থানে রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যায়। উত্তর এটাই। যোগ্যতা থাকা শর্তেও তাদেরকে অন্য নানানভাবে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয় বিকারগ্রস্ত পুরুষতন্ত্রের দ্বারা। আমাদের মস্তিকে যে ছয় ইঞ্চি গাছটা সজীবতায় লালিত পালিত হয়ে আসছে,তার লালন-পালনের ভার নিয়েছে সমাজ! সমাজের চোখে মস্তিস্কের এই গাছ সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত! তাই, আজকাল যখন দেখি একটা ছোট বাচ্চা- যে এই পরিবেশে থাকতে থাকতে শারীরিক পক্কতার আগেই মস্তিস্কে সেই গাছের ছবি আঁকে ফেলে, তখন আর কিছুই বলার থাকে না। এরাই বড় হয়, তাদের এতদিনের বিশ্বাস নিয়ে আর গাছের যত্ন নিতে নিতে।
এসব নানা কারণ বিবেচনা করে এটাই সত্য যে, নারীদের জন্য পৃথিবীটা খুবই কঠিন। মনে হয় তারা সত্যিই যেন পুরুষের রসদ জোগানোর জন্য সৃষ্টি!
পরিবেশ এমন যে, হাজার হাজারের ভিড়ে দুই চারজন পুরুষ যে তাদের স্বকীয়তা ধরে রাখবে, মিথ্যা পুরুষতন্ত্রের খোলস থেকে বের হবে – এটা সত্যিই কঠিন।তবুও আগের থেকে নারীরা অনেক শিক্ষিত হচ্ছে, অনেক সার্টিফিকেট অর্জন করছে। এসবের পাশাপাশি জ্ঞান চর্চায় তাদের এগিয়ে আসতে হবে। ক্ষেতে আগাছা জন্মালে আমরা যেমন কীটনাশক ছিটিয়ে আগাছা দূর করি, তেমনি পুরুষের মস্তিস্কে যে আগাছা বেড়ে উঠে ঘন অন্ধকার তৈরী হয়েছে, নারীরাই পারবে তা উপযুক্ত কীটনাশক দিয়ে দূর করতে।
এখানে সচেতন পুরুষদের ভূমিকা আছে অনেক। কাউকে হতে হবে’জিয়াউদ্দিন ইউসুফজাই’, কাউকে ‘ইব্রাহীম সাবের ‘ আর কাউকে হতে হবে ‘সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন ‘।
নারীদের বর্তমান অবস্থার উন্নতির জন্য পুরুষদের সর্বোত্তম সহায়তা ছাড়া নারীরা বিভেদের এভারেস্ট শৃঙ্গে ভারসাম্যে পৌঁছাতে পারবে না।

picture : collected.

অবলার পৃথিবী

মুখভর্তি ব্রণওয়ালী কুচকুচে কালো অতি চঞ্চল সদ্য বিবাহিতা গ্রামের সেই মেয়েটি, যে কখনো কথা বলতো না হয় শরমে কিংবা ভয়ে, সে আজ ইজি বাইকে চেপে শ্বশুর বাড়ী থেকে বাপের বাড়ী আসছে। সমস্ত রাস্তা ব্যাপক উদ্দীপনায় পার করার পর যখন সে নিজের শৈশব কৈশোর কাটানো গ্রামে প্রবেশ করলো, তখন এক অজানা শান্তি এবং মায়ার অবয়ব তার কালো মুখখানিকে কিছুটা উজ্জ্বল করে তুললো। গ্রামের রাস্তা ধরে যাওয়ার সময় ইতঃপূর্বে কথা না বলা পাঁচ-সাত বছরে বড় গ্রামের এক দাদার সাথে দেখা মাত্রই সদ্য বিবাহিতা হাসিভরা মুখে বলে উঠলো, “দাদা কেমন আছিস? ”
শুনে মনে হচ্ছিল যেন তারা দুজন দুজনার আপন ভাই-বোন।
দাদা অতিশয় মৃদু হেসে জবাব দিলো, ” ভালো আছি বোন। ” “তুমি কেমন আছো? ”
কিন্তু প্রশ্নের জবাব দিতে না দিতে চলন্ত ইজি বাইক থেকে মেয়েটির উত্তর বাতাসে মিলে গেল।
কিছুক্ষণ বাদে গ্রামের সেই দাদার মাথায় কিছু ভাবনার উদয় হলো।
সে ভাবলো, মানুষ যে বলে বাইরে গেলে নিজের গাঁয়ের (যেখানকার আলো-বাতাসে কেউ বেড়ে উঠে) খড়খুটোকেউ খুব আপন লাগে – কথাটা একেবারে ঠিক।
সবচেয়ে বেশি ঠিক আজন্ম আপন ঠিকানাহীন নারীর জন্য। যারা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শুধু আঁকড়ে ধরার চেষ্টাই করে নিজের আপনজনকে, নিজের পরিবেশকে। কিন্তু কেউ তাকে আগলে রাখে না। এমন হাজারটা ভাবনা দাদার মনের ভেতরে যুদ্ধ করতে লাগলো কিন্তু দাদা কিছুই বলতে পারলো না। কেন পারলো না, জানিনা ।,,,,,,,,,,,,,,,,

সময় খুবই কম

‘ পকেটে নকল নয়,পাওয়া গেল গাঁজা ‘ শিরোনামে প্রতিবেদন ছাপিয়েছে আজ এক অনলাইন পত্রিকা। বরগুনার এক এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে এক শিক্ষার্থীর পকেটে হাত দিয়ে পাওয়া গেছে গাঁজা।
বলার অনেককিছুই আছে। কোনটা রেখে কোনটা বলি!
এমন ছোট ছোট ছাত্রদের অনেকটা কাছাকাছি যেতে পারার ফলে আমি দেখেছি, ৮ম, ৯ম, ১০ম শ্রেণির ছাত্রদের একটা বড় অংশ সিগারেট টানা, গাঁজা সেবন করা থেকে শুরু করে মদ, ফেন্সিডিল, ঝাক্কি( কাশের শিরাপের সাথে ওষুধ মিশ্রিত দ্রবণ), ইয়াবা ইত্যাদি সেবন করে!
এসব নিজেকেই লিখতে খারাপ লাগছে। আমি আগে ভাবতাম, এসবের প্রভাব হয়তো শুধু শহরাঞ্চলেই। কিন্তু না, গ্রামে-গঞ্জেও পৌছে গেছে এসব উন্নতি! এই ছোট ছোট ছেলেরা কেমন যেন আক্রমনাত্মক হয়ে বড় হচ্ছে। এরা মানুষকে খুন পর্যন্তও করতে দ্বিধা করছে না।

এক ছাত্র পড়াতাম। পড়তো ষষ্ঠ শ্রেণিতে। আমাকে কয়েকদিন বলেছিল, “স্যার,কোন চাকুগুলো সবচেয়ে ভালো?” প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি কেন সে চাকুর কথা আমাকে বলছে। পরে একদিন আমার ছাত্র আমাকে একটা নতুন চাকু দেখিয়ে বললো, ‘স্যার এই চাকুটা আমি কিনেছি। এটা আমার সাথেই থাকে। স্কুলে গেলে নিয়ে যাই। “একমাত্র ছেলে তো, তাই মা বিষয়টা জানা সত্ত্বেও আমার নিরাপত্তার কথা ভেবে আমাকে কিছু বলেনি। ”
কথা শুনে আমি তো পুরোও থ হয়ে গেছি! সে বলে এটা নাকি তার নিরাপত্তার জন্য রাখা! এতটুকুন একটা ছেলে! কিভাবে এলো এই চিন্তা তার মস্তিস্কে?

বসন্ত বরণের দিন বন্ধু জীবনের সাথে ক্যাম্পাসের মাঠে বসে ছিলাম কিছুক্ষণ। পাশে ছিল ফুসকার দোকান। দোকানে অনেক মেয়েই বাসন্তী কালার শাড়ি পড়ে এসেছে। ছেলেরাও পড়েছিল হলুদ রঙের পাঞ্জাবী। অনেকে ফুসকার খাওয়ার জন্য আসতেছে দোকানে। দোকানের চারপাশে বসার জায়গা। তো পাশে আট দশ জন ছোট ছেলে। এইট নাইনে পড়বে হয়তো। এরা এত বেশি অসভ্যতামি শুরু করেছিল, মেয়েদের দেখে এত নোংড়া নোংড়া শব্দ উচ্চস্বরে বলছিল, হাসছিল আর মজা নিচ্ছিলো যে পুরো ব্যাপারটাই ছিল অসহ্যকর। আমরা খুবই ক্ষেপে গিয়েছিলাম কিন্তু বুঝতে পেরেছিলাম এসবের প্রতিবাদ করতে গেলে আমাদের সম্মান বাঁচবেনা। তাদের উচ্চারিত কথাগুলোর মধ্যে যা অশ্লীল নয় বা কম অশ্লীল তা হচ্ছে – মেয়েদের দেখে ওরা সজোরে বলছে ” ওই কিরনমালা, ওই পাখি, তোরে হেব্বি লাগছে, এদিকে আয়, মুতে দে ” ইত্যাদি!!উল্লেখ্য, এসব যাদের বলছে তারা সবাই অনেক সিনিয়র।
অনেক কাপল, অনেক সাধারণ মানুষ, কেউ তাদের প্রতিবাদ করেনি! আমরাও না! ভয়ে, সম্মানের ভয়ে। আর ছোট হলেও এরা নাকি বখাটে। ছোট হলেও নাকি এসব বাচ্চাদের অনেকের হাত অনেক বড় বড় হাতের সাথে মিলানো।

ওদের আরো অন্যকোন পরিচয় থাকতে পারে কিন্তু একজন স্কুল পড়ুয়া ছাত্রের এমন দুরবস্থা কেন?

যেখানে বই পড়ার কথা, কোমলমতি হবার কথা, গুরুজনদের অনুগত হওয়ার কথা – এরা কেমন যেন এক বিরুপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে বড় হচ্ছে!

কে বা কারা এসবের অনুঘটক হিশেবে কাজ করে?

এমনিতেই শিক্ষাখাত বর্তমানে প্রশ্নে জর্জরিত! চেষ্টা করে হোক বা না করেই হোক প্রশ্ন ফাঁস কোনভাবেই ঠেকাতে পারছে না প্রশাসন! এটা একটা জাতির জন্য একটা বড় লজ্জ্বার ব্যাপার। এসবের প্রভাব পড়ছে কিনা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর?

যেখানে সেখানে গুম, খুন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি – এসবের প্রভাব পড়ছে কিনা এসব উঠতি ছেলে-মেয়েদের ওপর?

রাজনৈতিক বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুপ প্রভাব পড়ছে কিনা এসব শিক্ষার্থীদের ওপর?

আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চাহীনতার প্রভাব পড়ছে কিনা এদের ওপর?

আমার মনে হয় সময় খুবই কম। এখন যদি এসবের কারণ এবং সমাধান না বের করি, তাহলে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক গভীর অমঙ্গল।

বিশেষ আদেশ

কোন এক মঘাপ্রেমিক- প্রেমিকা বসুধাকে আদেশ করেছিল এভাবে :
দুরাত্মার বীজ বপন করো তোমার উর্বর ভূমিতে, বপন করো অসহিষ্ণুতার বীজ।
অগণিত চারাগাছ পুষ্টি পেয়ে বেড়ে উঠুক দলে দলে।
ছায়া দিতে গিয়ে ঢেকে ফেলুক সব – কালো আঁধারে।
তুমিও হয়তো হবে গৌণ,
আমিও কাটাবো দিন আলোহীন নিরবতায়।
কি দিন, কি রাত
সময় করবো পার
এখন যেমন যায়।

কীট

আমি না হয় ঘুমিয়ে ছিলাম-
মাটি চাপা কোন সভ্যতায়,
তাই বলে তুমি পিছিয়ে গেলে-
পশুত্বে আর নগ্নতায়?

আলো দেখলে ভয়ে পালাও
ধ্বংস যজ্ঞে দু’হাত বাড়াও,
কোন শিক্ষায় নিলে দীক্ষা-
কোন সুখের আশায়?
— পশুত্বে আর নগ্নতায়।

নগ্ন দেহে কী এসে যায়!
মন নগ্ন ভয়ানক,
মানুষেরে তাই অবজ্ঞা করে
খুঁজিতেছো রোজ সাদা বক।

সাদা পায়রায় বিশ্বাসী নও,
বকের মধ্যে যত সুখ ;
প্রাচীন সব তাই -ভাঙিস খুঁজে,
পচে যাওয়া বিশাক্ত পুঁজ।

< ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ >