ষড়যন্ত্র

বাংলাদেশে মনে প্রাণে বাঙালি খুব কমই আছে । যে দু’একজন আছে তারাও পড়েছে অসুখে ; জ্বালা-পোড়া অসুখে। মাঝেমাঝেই এদের জ্বালা-পোড়া শুরু হয়। তারা আজকাল পিঁয়াজের খোসা তুলে তুলে নতুন কিছু বের করার মত করে বাঙালির সংস্কৃতি রক্ষা করতে চায়! এটা চলবে না, ওটা চলবে না, ওভাবে হবে না, এভাবে হলে কোন সমস্যা নেই – এসব করতে করতে সর্বশেষ কোথায় পৌছাবে তারা নিজেরাও জানে না। বাঙালিত্বের নতুন নতুন রূপরেখা বাঙালি জাতির শরীরে বারংবার অস্ত্রপাচার করছে! এ অস্ত্রপাচার শুধু কোন পক্ষের মন রক্ষার্থে নতুবা মৃতকে দীর্ঘদিন জীবিত রাখার স্বার্থে! কারণ দুইয়ের যেটাই হোক -ক্ষতিকর!

ফেইসবুকে নানান গৃহ ঘুরে, ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও/বয়ান দেখে আমি এইটুুক সিদ্ধান্তে পৌছেছি যে, এক অনন্ত ষড়যন্ত্র চলছে বাঙালির শেষ বিন্দু ধ্বংস করতে!

এজন্য ‘শুভ নববর্ষ ‘ বলতে গিয়ে কাল অবদি বহুবার থেমেছি। লোক দেখানো এসব কালচারে কী আসে যায়, যেখানে ভিতরটায় গভীর ক্ষত?

স্মৃতিচারণ

বয়সে একদম নতুন বলে স্কুলের নাম অনেকেই ‘নয়া স্কুল ‘ বলতো। মফস্বলের মধ্যে নতুন হওয়া স্কুলে তাই অনেক কিছুই ছিল না। সবেমাত্র বাঁশের ধারার টাটির পরিবর্তে ইট গেঁথে উপরে খাড়া টিনের ব্যবস্থার মধ্যে চলতো পাঠদানের কার্যক্রম।
জানিনা আমার এক যুগ আগেকার স্মৃতির রোমন্থনের সাথে কেমন উন্নয়ণ হয়েছে আমার সেই স্মৃতির বিদ্যাপীঠের।
সেখানকার সম্মানিত শিক্ষকগণের কথা মনে পড়ছে । যারা আমাদের ক্লাস নিতেন তাঁদের সবাই আমার কাছে খুব শ্রদ্ধার ছিলেন। এ তালিকায় বাদ যায়নি আমার শিক্ষক, জেঠতুতো ভাইও। যাক্ আজ শুধু আমি একজন শিক্ষকের কথাই লিখবো।

তিনি আমাদের বাংলা ক্লাস নিতেন। নামঃ বাবুল চন্দ্র দেব নাথ। খুব রসিয়ে রসিয়ে কথা বলতেন তিনি। বেশ ফর্সা এবং স্বাস্থ্যবান স্যার নিজে হাসতেন, আমাদের হাসাতেন আর মজায় মজায় মাধ্যমিকের বাংলা সাহিত্য পড়াতেন। মফস্বলের পড়াশোনার দুরবস্থার দরুণ আমরা অনেকেই জানতামই না যে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে নোট-গাইড ছাড়া পড়ার কোন বই আছে! স্যার আমাদের কখনো কখনো পড়াশোনার গুরুত্ব বুঝাতে ক্লাসে আমাদের সামনে আবৃত্তির স্বরে ও ভঙ্গিতে উচ্চারণ করতেন –

”রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত-যৌবনা – যদি তেমন বই হয়। “

এটা বলে চমৎকারভাবে বলতেন- ওমর খৈয়াম।

আমার ব্যক্তিগতভাবে লাইন ক’টা খুব ভালো লাগতো। পড়ানোর ফাঁকে তিনি আমাদের গল্প শোনাতেন। তখন আমি নবম শ্রেণিতে পড়ি। সেই সময়ে আমি প্রথম ‘হৈমন্তী’ ও ‘বিলাসী’র নাম শুনি স্যারের মুখে। স্যার ‘হৈমন্তী ‘ গল্পে তৎকালিন সমাজব্যবস্থা ও যৌতুকপ্রথার বলি গল্পের নায়িকা হৈমন্তীর করুণ কাহিনি তুলে ধরতেন। ‘বিলাসী’ গল্পেও একইভাবে মৃত্যুঞ্জয়-বিলাসী-ন্যাড়ার মাধ্যমে সমাজের বাস্তবতা ও কুসংস্কারের যে ছবি লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন – তা বুঝাতে চাইতেন। আমার কাছে এসব ছিল অনেক পাওয়া। স্যার হয়তো অনেক ভাবতেন; আমাদের মত পিছনে পড়ে থাকা ছাত্র-ছাত্রীদের কথা চিন্তা করতেন।

আমার স্পষ্ট মনে আছে, স্যার একদিন ক্লাস শেষে আমাদের এক এক ক’রে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী। অর্থাৎ বড় হয়ে আমরা কী হতে চাই? সবাই যে যার মতো মুখস্ত কিছু শব্দ উচ্চারণ করলো ওই ছোট বয়সে যেমনটা বলে। কেউ বললো আমি ডাক্তার হতে চাই, কেউ বললো ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই এমনসব। আমার কাছের বন্ধুটি বলেছিল, “আমি পুলিশ হতে চাই। ” তার মনে আছে কিনা জানিনা কিন্তু সে আজ পুলিশ হতে পারে নি। সে আজ এক বেসরকারি ব্যাংকে জব করে। একই প্রশ্ন আমাকে করাতে আমি বলেছিলাম – স্যার, আমি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে চাই। সবার উঁচু উঁচু লক্ষ্যের ভিরে যেন আমার লক্ষ্য ছিল লক্ষ্যহীন। আমার বন্ধু-বান্ধবদের অনেকেই আজ ঝরে পড়েছে। কেউ কেউ সংসার সামলাচ্ছে; বাস্তবতায় হয়ে গেছে অনেক ব্যস্ত। স্যারকে আজ আমার বলার খুব ইচ্ছে হচ্ছে – স্যার, আমিই বুঝি আমার লক্ষ্য পূরণ করতে সচেষ্ট হয়েছি। আজ আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মোটামুটি শেষ। আজ যখন দেখি – কত অসৎ মানুষ চোখের সামনে, কত মানুষ অন্যায় করছে উঁচু উঁচু কর্মক্ষেত্রে উঁচু উঁচু পদবী নিয়ে – তাদের মধ্যে নিজের সততা ও ন্যায়বোধ নিয়ে শিক্ষিত থাকাতেই আমি খুব সুখীবোধ করছি, স্যার।

একদিন ক্লাসে স্যার আমাদের একটা গল্প বলেছিলেন এভাবে —-

“মনেকর, এই ক্লাসরুমে এক দৈত্য এসে তোমাকে একবস্তা টাকা দিল। সেই টাকায় তুমি কী করবে? ”

আমরা যে যার মতো উত্তর দিলাম। কেউ বললো বাড়ি বানাবো, কেউ বললো গাড়ি কিনবো। মোটামুটি সবারই ছিল এমন চিন্তাহীন সব উত্তর।
স্যার তখন আমাদের বলেছিলেন এভাবে- যে স্কুলে এই টাকাটা পেলে সেখানকার উন্নয়ণ নিয়ে কেউ কিছু বললেনা! আমি আমার ভুলটা ধরতে পেরেছিলাম। আজ দেখছি – আমাদের সমাজের অবস্থাটা হলো ছোট্ট আমাদের অপরিপক্ক উত্তরগুলোর মতো।
স্যারের এমন অনেক কথা মনে পড়ে। ক’দিন আগে দীর্ঘ দশ-বারো বছর পর স্যারকে ফোন করেছিলাম কিন্তু স্যারের ব্যস্ততার জন্য কথা বলা হয়নি। এরই মধ্যে আমাদের ছাত্র-শিক্ষকের অনেক দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে । স্যার হয়তো বুঝতেও পারেননি যে আমি ফোন করেছিলাম।
এখনো আপনাদের খুব শ্রদ্ধা করি, স্যার। আপনাদের দেওয়া শক্তিই তো আমাকে এতোদূরে নিয়ে এসেছে ।
পরিশেষে আপনাদের মঙ্গল কামনা করে শেষ করছি। ভালো থাকবেন।