দুই তিন দিন

গত ১০ মে ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার নিয়োগের পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষাটা ছিল সকাল ১০:৩০ এ। আমাকে ৩৩৪ কি.মি. পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হবে ঢাকায়।এত দূর থেকে পরীক্ষা দিতে ঢাকায় গেলে শরীরে যতটা এ্যানার্জি থাকে তার অর্ধেক রাস্তাতেই শেষ হয়ে যায়। তাই আমি একদিন হাতে নিয়েই ঢাকা যাই যেন রাতটা বিশ্রাম নিয়ে পরদিন পরীক্ষা দিতে পারি। বাংলাদেশে বেকারদের অবস্থা খুবই করুণ। কোন ছোট-বড় পদ নয় সরকারি চাকরীতে নিয়োগের সার্কুলার হলেই আবেদনের হিড়িক পড়ে। লক্ষাধিক বেকার খুব ভালোভাবে পড়াশুনা করেও বেশি পদ ফাঁকা না থাকায় ফল ভালো হয় না। আগে অনার্স মাস্টার্স শেষ করা শিক্ষিতের সংখ্যা ছিল খুবই কম। ফলে চাকরীতে প্রবেশের জন্য তাদের এত জটিলতাও ছিল না। আজকের দিনে উচ্চ শিক্ষিতের সনদপ্রাপ্তদের সংখ্যা যে হারে বেড়েছে সে হারে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা আমাদের মত দেশে ওতোটা সহজ নয়। কিন্তু সমস্যাটা যে রাষ্ট্রীয় এতে কোন সন্দেহ নেই। তবুও চাকরীর জন্য ছুটতে থাকা বেকারদের একাংশ সৃষ্ট এই সমস্যাকে নিয়তি ভেবে এগিয়ে চলে দিনকে দিন।
এরই মধ্যে সমাজে এক অলিখিত নির্ণয় চালু হয়ে গেছে। যে শিক্ষিত উচ্চ শিক্ষা নিয়ে সরকারি কোন চাকরী নিতে ব্যর্থ হয়, তার সামাজিকভাবে তেমন কোন মূল্য নেই! শিক্ষিতের মূল্যায়ন হয় আজকাল সরকারি চাকরী, নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এসবে !

আমি ৯ তারিখ সকালে মিরপুর -১ এ বন্ধুর বাসায় পৌছালাম। দীর্ঘ আট নয় ঘন্টা যাত্রা শেষে শরীরের অবস্থা ক্যাতক্যাত হয়ে গেছে। চুলগুলোতে মনে হয় কেউ আঠা মেখে দিয়েছে। চোখে মুখে ধুলোর স্তর পড়ে গেছে! চোখের পাতাগুলো যেন সরতে চায় না!
বন্ধু আমাকে সযত্নে রিসিভ করে ফ্রেশ হওয়ার জন্য বাথরুম দেখিয়ে দিল। আমি বাথরুম সেরে আসলাম। খুব পিপাসা লেগেছিল। একটু পানি পান করবো। ওরা আবার পানি ফুটিয়ে পান করে। ফুটানো পানি আর সাধারণ পানির স্বাদের যে ভিন্নতা তা আমি আগেও বুঝেছি। আমি পানি পান করলাম কিন্তু তৃপ্ত হলাম না।
শরীর খুব ক্লান্ত। তাই বিছানায় শরীর এলিয়ে দিতেই ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি দুপুর পেড়িয়ে গেছে। বাইরে অত্যধিক গরম এটা টের পাচ্ছি রুমে দুটো ফ্যান চলছে তারপরও কেমন লাগছে সেটা অনুভব করেই।
বন্ধু এসেছে অনেক দূর থেকে, বন্ধুকে তো অাপ্যায়ন করতে হবে। কিন্তু কিভাবে?
ওরা যে বাসায় থাকে তাতে ও বাদে সবাই রোজা রাখে। এজন্য খাবার একটু সমস্যা। আমি অবশ্য বাস থেকে নেমেই হোটেলে খেয়ে যেতাম। কিন্তু সকালে কোন হোটেল খোলা ছিল না। তাছাড়া ওখানকার ভাতের হোটেলগুলো বন্ধ থাকে। আমার বন্ধু আমাকে জানালো, রাতের অবশিষ্ট ভাতগুলোয় নাকি পানি ঢেলে পান্তা করে রেখেছে ওর বাসামেটগুলো। অনেকদিন পান্তা খাওয়া হয় না। আমি আর আমার বন্ধু মিলে পাশে বাজার থেকে শুটকি মরিচ পেয়াজ এনে তা ভেজে শুটকি আলু ভর্তা দিয়ে পান্তা খেলাম। আমি কিন্তু বেশ ভালোই খেলাম। আজকাল তো মানুষ পয়লা বৈশাখে ছাড়া পান্তা খায়ই না। আমাদের বাড়িতে একসময় প্রায়ই সকালে পান্তা খেতাম। শুটকির ভর্তা, কাঁচা মরিচ-পেয়াজ,লবন দিয়ে খাইতাম যা এখনো মনে করিয়ে দেয় সোনালী অতীত।
পান্তা খেলে নাকি ঘুম ভালো হয়। আমরা দারুণ একটা ঘুম ঘুমালাম। সন্ধ্যা হবার আগেই উঠলাম। বন্ধুর রুমমেট বন্ধুটি সহ অন্যরা সবাই মিলে ইফতার আয়োজন করেছে। খুব অান্তরিকতার সাথে তারা আমাকে ডাকলো, অামন্ত্রণ করলো। আমি তাদের সাথে অংশগ্রহন করলাম। তাদের আন্তরিকতা বেশ ভালোই লাগলো। আমি আগেও বহুবার ইফতার করেছিলাম। আমার সাবেক রুমমেটরা আমাকে নিজের ছোট ভাইয়ের মত করে সাথে নিয়ে ইফতার করতেন। আমি তাদের প্রতি এক গভীর টান অনুভব করি।
তারপর রাতে খাবার খেয়ে আবার ঘুম। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই ফ্রেশ হয়েই একটু পানি মুখে দিয়েই বন্ধুর নির্দেশনায় বেড়িয়ে পড়লাম পরীক্ষা সেন্টারের দিকে। মিরপুর-১ থেকে খিলগাঁও, আলী আহমেদ স্কুল এন্ড কলেজ। ‘বাহন’ নামের বাসে উঠে আমি খিলগাঁওয়ে পৌছালাম। ভাড়া নিল ৪৫ টাকা। বাসে এত বেশি টাকা ভাড়া ঢাকা শহরে এই প্রথম দিলাম। বাস থেকে নেমেই এক বড় ভাইয়ের সাথে দেখা। ওনার পরীক্ষাও আমার সাথে,একই সেন্টারে। ওনি সাথে করে ওনার ছোট ভাইকে নিয়ে যাচ্ছেন (যে এবার অনার্স শেষ করলো) যাতে বুঝতে পারে বাংলাদেশে চাকরীর অবস্থা কেমন।

অনেক দূরে গিয়ে হঠাৎ পরিচিত কাউকে দেখলে পরিচিত মানুষের প্রতি এক অন্যরকম ভালোবাসা কাজ করে। খুব আপন মনে হয়। আমরা আলাপ করতে করতে অনেকটা হেঁটে পরীক্ষা সেন্টারে গেলাম।

“ভাই, রোজা আছেন?”
ভাই বললো নারে, রোজা নাই।
“কিছু খেয়েছেন?”
-“হ্যাঁ, আমরা বাসায় খেয়ে এসেছি।
তুমি খেয়েছো?”
আমিঃ না ভাই, খাইনি।
ভাই বললো, “চল দেখি আশেপাশে নাস্তার দোকান খোলা আছে কিনা।”
আমরা এক নাস্তার দোকান পেলাম যেটা সবেমাত্র খুললো। আমি একটা কেক খাইলাম। ভাই সিগারেট ধরালেন। তারপর তিনজনই চা খেলাম।

পরীক্ষার সেন্টারে ঢুকলাম সাড়ে ন’টায়। পরীক্ষা শেষে ভাইয়ের সাথে বিদায় নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম। ঢাকা শহরে আমি কিছুই চিনি না তেমন। মাঝে মাঝে দিক মিলাতে পারি না। পশ্চিমকে মনে হয় দক্ষিণ, পূর্বকে উত্তর! তবে সমস্যা হয় না, স্ট্রিট ভিউ চালু করে মোবাইলের স্ক্রিন দেখে দেখে যেতে পারি। বাইরে প্রচন্ড গরম। হালকা তাপমাত্রা সহ্য করে অভ্যস্ত শরীরে আমার দর দর করে ঘাম ঝড়ছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাস খুঁজছি। একে তো জানি না কেন বাস কোথায় যায়, বাসের গায়ে লেখা দেখে দেখে বাসে উঠার লাগে। অবশেষে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে বাসে উঠলাম। বাসায় এসে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

বন্ধু আমার ততক্ষণে ভাত রান্না করা শুরু করে দিয়েছে। আমি এক ক্লান্তির গোসল শেষে দুজনে দুপুরের খাবার খাইলাম। তারপর একটু ঘুমিয়ে আবার রাত ন’টায় বেরিয়ে পড়লাম গাবতলি বাস টার্মিনালের দিকে। রাত ১০টায় আমাদের বাস। বাসে উঠে একটা ক্লান্তির ঘুম দিয়ে দিলাম। আড়াইটার দিকে আমরা ফুট ভিলেজে পৌঁছলাম। সেখানে এসে দেখি বাউল সুকুমার সরকারের মত এক লোক। আমি এবং আমার এক ভাই, আমরা তাঁর কাছে গেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি বাউল সুকুমার সরকার কিনা।
তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি বাউল সুকুমার সরকার।
ইদানিং তার –

”বলবোনা গো আর কোনদিন ভালোবাসো তুমি মোরে,,,,
গানটি ভাইরাল হয়েছে। আমি অনেকবার গানটি শুনেছি। বেশ দরদি কন্ঠে গেয়েছেন।
তারপর আবার ঘন্টা চারেক পরে আমরা গন্তব্যে এসে পৌছালাম। যেন মায়ের কোলে এসে পৌছালাম। সূর্য তখনো উঠে নি। কিন্তু চারপাশটা বেশ ফটফটে। শান্ত পরিবেশ। দু একটা পাখি কিচিরমিচির করছে, কাকেরা এদিক থেকে ওদিকে উড়ছে। এক সুনির্মল হাওয়া আমার সমস্ত ক্লান্তিকে ভুলিয়ে তৃপ্ত করতে আমাকে শিহরিত করলো। আমি মেসে এসে ফ্রেশ হয়ে তৃপ্তিভরে মাতৃদুগ্ধের ন্যায় সুমিষ্ট পানি পান করে তৃপ্ত হলাম। রুমমেট ঘুমায়, আমিও এক গভীর ঘুম দিয়ে দিলাম। উঠে দেখি প্রায় দুটা বাজে। খিদায় পেট চো চো করছে। আমি মেস থেকে কিছুটা দূরে এক খাবারের হোটেল আছে সেখানে খেতে গেলাম। বেশ ভালো রান্না করে। ভাতের জন্য হোটেলটা স্পেশাল। সাধারণত হোটেলে খেলে আমার গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয় কিন্তু সেখানে খেলে তেমন কোন সমস্যা হয় না। খেয়ে এসে দুই রুমমেট মিলে আবার ঘুম । রুমমেট আমার ফোর্থ ইয়ার ফাইনাল দিচ্ছে। দুজনে আমরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ আমার মনে হলো রুমমেটতো রোজা আছে। ইফতারের তো সময় চলে যাচ্ছে। তখন বাজে ৬ টা ২৪। আমি রুমমেটকে নাম ধরে ডাকলাম, ভাইয়া উঠো, উঠো,,
তোমার ইফতারের সময় চলে যাচ্ছে। রুমমেট তাড়াহুড়ো করে উঠে ইফতার নিয়ে আসলো। আমি শরবত বানালাম। তারপর আমাকে নিয়ে সে ইফতার করলো।
কয়েকদিন বাইরে খেতে খেতে পকেটের অবস্থা খারাপ। পুরো মাস এভাবে যাবে। এটা বুঝতে পেরে রুমমেট ছোট ভাইটা তার এক হিন্দু বন্ধুর মেসে মিল চালু করার জন্য বলেছে সেটা আমাকে বললো।
এই দুইদিন বাসে, বাসায় বেশ ঘুমিয়েছি। আমার মা বলতো, শোকের চেয়ে ভোগ(ক্ষুধা) বড়, ভোগের চেয়ে ঘুম।
আমার শরীর ক্লান্ত হলে আর রক্ষে নেই, যে করেই হোক একটু ঘুমের যায়গা চাই।
কিছুদিন ধরে তেমন কিছুই পড়িনা। খুব অলস আর সামাজিক জীবন-যাপন করছি। সামাজিক জীবন-যাপন মানে এই যে একটা চাকরী পেতে হবে, এটা করতে হবে সেটা করতে হবে – এসব।
আহমেদ ছফার ‘যদ্যপি আমার গুরু’ বইটা খুব সময় নিয়ে যত্ন সহকারে পড়ছিলাম। কয়েকটা পেইজ বাকী ছিল। হাতে নিয়ে শুয়ে শুয়ে বইটা পড়া সমাপ্ত করলাম। এরই মধ্য অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যত নিয়ে নানান ভাবনা আমাকে ভাবিত করলো। বাংলার লেখকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীলতা গুণটি আমাকে খুব পীড়া দেয়। সে আমাকে, আমার আদর্শকে পচিয়েছে, আমি তাকে, তার আদর্শকে পচাবো। আমাকে লিখতে হবে অমুককে ডিফেন্ড করে। লেখক বুদ্ধিজীবীদের এমন মনোভাব মানুষকে কখনো মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগের বৃত্ত থেকে বের করতে পারে না। যা পারে তা হলো গন্তব্যহীন এক বাজে ভবিষ্যতের দিকে ঢেলে দিতে।
এসব করতে করতে টিউশনের সময় হয়ে গেল। পড়াতে যেতে হবে অনেকটা দূরে।

বিকেল ৩ টা বেজে ৪৫ মি.
<১২ মে, ২০১৯খ্রি.>